![]() |
| প্রাক্তন (পর্ব ০৭) |
প্রাক্তন (পর্ব ০৭)মিশিতা চৌধুরী
বিছানা থেকে নেমে এসে দেখি মুন জায়নামাজে বসে ভীষণ কান্না করছে।
একটু অবাক হলাম।এতো রাতে কান্না করার কারণ কি? তবে কি তারও কোনো মন ভাঙ্গার গল্প আছে!
বিছানার দিকে পা বাড়াবো তখনই কানে এলো---
-আল্লাহ তোমার কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া। তুমি আমায় এতো বড় একটা নিয়ামত দান করেছো। আমার জীবনে শ্রেষ্ট মানুষটাকে পেয়েছি।সে অন্য কাউকে ভালোবেসে জেনেও আমি তাকে ভালবাসি। খুব ভালোবাসি। নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্য কারোর সাথে ভাগ করতে বুকটা ফেটে যায়। আল্লাহ তুমি তাকে পুরোপুরি আমার করে দাও। আমি তার প্রথম ভালোবাসা হতে পারি নি। তার শেষ ভালোবাসা হয়ে যেন সারাজীবন থাকতে পারি।
ভীষণভাবে অবাক হলাম। একটা মানুষ আমায় এভাবে চাইছে আল্লাহর কাছে।তবে কি আমি মুনের সাথে অন্যায় করছি!
আমি তাড়াতাড়ি বিছানায় এসে ঘুমের ভান ধরে শুয়ে পড়লাম। যাতে মুন কিছু বুঝতে না পারে। মুন এসে দোয়া পড়ে আমার মাথায় ফুঁ দিয়ে দিলো।তারপর শুয়ে পড়লো।
একটু পর মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়লো। মেয়েটা দেখতে ভারী মিষ্টি। এতো দিন একবারের জন্যও ভালোভাবে তাকাই নি ওর দিকে।তার মুখটা বড্ড মায়াবী।
সকালে ঘুম ভাঙ্গলো মুনের মিষ্টি মধুর কুরআন তেলাওয়াত শুনে। মন প্রাণ সব জুড়িয়ে গেল। এতো সুন্দর কন্ঠ একটা মানুষের কি করে হয়!! সমস্ত খারাপ লাগা এক নিমিষেই উধাও হয়ে গেছে।
------------------------------------------------------------
এভাবে এক সপ্তাহ কেটে গেল। একদিকে মুনের যত্ন, ভালোবাসা অন্য দিকে ঋতুকে হারানোর কষ্ট। অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করতে লাগলো।
ঋতুর কোনো খোঁজ নেই।ওর বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করেও কোনো খোঁজ পাই নি। হয়তো আমার বিয়ে হওয়ায় যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। ভীষণ মিস করতে লাগলাম।করার মতো কিছুই নেই। কোথায় খুঁজবো!! হারিয়ে যাবেই যখন একটা বার জানিয়ে যেতে। মনে মনে ঠিক করলাম আমি ঋতুকে ভুলে যাবো।যে আমায় নিয়ে ভাবে না তাকে নিয়ে আমি আর ভাববো না। এমন সময় আম্মু এসে বললো-
-রাশেদ বাবা বৌমার বাবা ফোন করেছে। তোদের বেড়াতে যাওয়ার জন্য বলেছে। বিয়ের পর তো আর যাওয়া হয়নি। গিয়ে ঘুরে আয়। বৌমার ভালো লাগবে।
-আম্মু আমি যাবো না। অফিসে অনেক কাজের চাপ। তুমি ওকে পাঠিয়ে দাও।
-আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না। আমি বৌমাকে কথা দিয়েছি। বিকালে তোরা যাচ্ছিস এটাই ফাইনাল।
বিকেলে মুনকে নিয়ে ওর বাবার বাসায় যাওয়ার জন্য রওনা দিলাম। গাড়িতে মুনের সাথে টুকটাক কথা হলো। হঠাৎ মুন বললো--
-রাশেদ গাড়িটা একটু থামান।
-মাঝপথে গাড়ি থামাতে বলছেন কেন?
-প্লীজ থামান। দরকার আছে।
গাড়ি থামাতেই মুন একটা ফুলের দোকানে দৌড় দিলো।
কিছুক্ষণ পর ফিরলো হাতে কতগুলো গোলাপ আর রজনীগন্ধা ফুল। এগুলো তো আমারও পছন্দের ফুল।মেয়েটা ফুল এত্তো পছন্দ করে। নইলে এমনভাবে গাড়ি থামিয়ে ফুলের জন্য ছোটে কেউ!!!
ঘন্টাখানেক পর আমরা মুনের বাড়ি পৌঁছে গেলাম। মুনের কাজিনরাও আছে। তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল--
-কি দুলাভাই মুন আপুকে পেয়ে আমাদের ভুলে গেলেন! এবার কিন্তু সহজে ছাড়ছি না। আমাদের পাওনা কড়ায় গন্ডায় মিটিয়ে নেবো।
আমি হেসে বললাম,"তাই নাকি শালিকা। ঠিক আছে আমি আপনাদের সেবায় সবসময় নিয়োজিত থাকলাম।"
"আমাদের সেবায় নিয়োজিত থাকলে আপনার বউ যে গাল ফুলিয়ে বসে থাকবে"
"আমার বউটা ভারী লক্ষ্মী। সেতো আমার সাথে থাকবে।"
"হাহাহা এখনি এতো প্রেম! বাব্বাহ!!!
-কি শুরু করলি তোরা। সবে ওরা এসেছে একটু জিরিয়ে নিতে দে। কতোটা পথ ড্রাইভ করেছে। যাও বাবা তুমি রুমে গিয়ে একটু রেস্ট নাও। মেয়েটাও হয়েছে যেমন। কোথায় জামাইয়ের কি লাগে না লাগে দেখবে তা না আসতে না আসতেই ব্যস্ত।
-মা আপনি এতো অস্থির হচ্ছেন কেন। আমি তো আপনার আরেকটা ছেলে। আমায় নিয়ে এতো টেনশন করবেন না তো। আমি একদম ঠিক আছি। আপনি অনেক কাজ করেছেন এবার একটু বসুন।
-বাবা আমি নাস্তা....
-সেসব পরে হবে। আপনি এতো উতলা হবেন না।
-এই আদ্র, রাশেদ বাবাকে মুনের রুমে নিয়ে যা।
"আসুন ভাইয়া আমার সাথে রুমে নিয়ে যাই"
রুমে এসে জিমা কাপড় চেঞ্জ করে বসছি।রুমটা খুব সুন্দর করে সাজানো। মুনের পছন্দের তারিফ না করে থাকা যায় না। অনেক যত্নে গুছিয়ে রেখেছে। আমি বসা থেকে উঠে প্রত্যেকটা জিনিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। সব মিলিয়ে রুমটা অসাধারণ লাগলো।
-কি দেখছেন ওভাবে?
-আপনার রুমটা খুব সুন্দর।
-ওহ। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ
-রুমের প্রশংসা করেছি বলে?
-না সবার সাথে এতোটা হাসিখুশি ভাবে মেশার জন্য।
-ওহ আচ্ছা।
-মা আপনাকে খেতে ডাকছে।
-হুম চলুন।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই মিলে অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম। আড্ডা দেওয়া শেষ করে ঘুমাতে চলে এলাম। মুন বললো---
-আপনার বিছানা করে দিয়েছি। শুয়ে পড়ুন
-আপনি কোথায় শোবেন?
-সোফায়।
-না, আপনি বিছানায় শুয়ে পড়েন ।আমি সোফায় শোবো।
-আপনি মেহমান। মেহমানদের সোফায় শুতে দেওয়া ঠিক না।
-ঠিক আছে আমরা একটা সমঝোতায় আসি। কি বলেন!
-কেমন সমঝোতা?
-খাট তো অনেক বড় আপনি খাটের ওপাশে শুয়ে পড়ুন। আমি এপাশে শুয়ে পড়ি।
-আপনার অসুবিধা....
-কোনো অসুবিধা হবে না।
-হুম। আমার কয়েকটা শর্ত আছে।
-ওরে বাবা শর্ত!!!!
-হাত পা ছোড়াছুড়ি করবেন না।নাক ডাকবেন না। মাঝখানে একটা কোলবালিশ থাকবে।
আমি মুচকি হেসে বললাম,"জ্বি মন্ঞ্জুর"
দেখতে দেখতে দুইদিন কেটে গেছে। যেদিন চলে আসবো সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মুন নেই। এদিক ওদিক খুঁজলাম কোথাও পেলাম না। কোথায় গেল মেয়েটা।
-মা মুন কোথায়? অনেকক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না।
-বাবা মুন তো ওর বান্ধবীদের সাথে দেখা করতে গেছে। অনেকদিন দেখা হয় না। তুমি ঘুমাচ্ছিলে তাই আর ডাকে নি।
-ওহ আচ্ছা।কখন আসবে বলে গেছে?
-চিন্তা করো না চলে আসবে।
মুন না থাকায় খুব একা একা লাগছিলো। রুমে এসে বসে আছি। মুনের রুমে একটা ছোট লাইব্রেরি দেখতে পেলাম। ওখানে অনেক লেখকের বই সাজানো। বইগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা ডায়েরি চোখে পড়ল।উপরে লেখা,"না পাওয়া ভালোবাসা"।
ডায়েরিটা হাতে নিলাম। অন্যের জিনিস না বলে ধরতে নেই। কিন্তু ডায়রি ভেতরে কি আছে তা দেখার জন্য কৌতুহল হচ্ছে খুব। কিছুতেই দমিয়ে রাখতে পারছি না।সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম ডায়েরি টা পড়ার। পাতায় খুলতেই দেখলাম.........
***চলবে***
