প্রাক্তন (পর্ব ০৯)

প্রাক্তন (পর্ব ০৯)
প্রাক্তন (পর্ব ০৯)


প্রাক্তন (পর্ব ০৯)
মিশিতা চৌধুরী


ওপাশ থেকে মেয়েলী কন্ঠে বলে উঠলো---

-কিরে বিয়ের হওয়ার পর আমাকে তো ভুলেই গেলি। একবারের জন্যও মনে পড়ে নি আমায়।এতো বছর পর নিজের ভালোবাসার মানুষকে পেলে পৃথিবীর অন্য সবকিছুর কথা ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক।কিন্তু তাই বলে আমায় ভুলে যাবি!!!

-আমি মুনের হাজবেন্ড বলছি।


মেয়েটা ইতোস্তত হয়ে বলল,"সরি ভাইয়া আমি বুঝতে পারি নি। কিছু মনে করবেন না।আমি মুনের বেস্ট ফ্রেন্ড তিন্নি। আপনাদের বিয়েতে দেখা হয়েছিল।আপনার সাথে কথাও হয়েছে।

-ওহ আচ্ছা।মনে পড়েছে। কেমন আছেন?

-ভালো আছি ভাইয়া।আপনি কেমন আছেন?

-জি ভালো আছি।

-আচ্ছা ভাইয়া মুনকে একটু দেওয়া যাবে? অনেক দিন কথা হয় নি।

-মুন তো বাসায় নেই।আম্মুর সাথে মার্কেটে গেছে। ভুলে ফোনটা রেখে গেছে বাসায়।

-ওহহ আচ্ছা। ঠিক আছে ভাইয়া মুন এলে বলবেন আমি কল দিয়েছি।

-আচ্ছা। আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।

-জি বলুন। আপনি বললেন মুন তার ভালোবাসার মানুষটির সাথে আছে। বুঝতে পারলাম না কথাটা। একটু বুঝিয়ে বলবেন?


মেয়েটা হাসতে হাসতে বলল,"মুন আপনাকে কিছু বলে নি!ও এরকমই। আপনিই তার ভালোবাসার মানুষ।

-আমিইইইইইই!! সেটা কিভাবে সম্ভব?

-হাহাহা!সে অনেক কাহিনী ভাইয়া। বলতে গেলে একটা প্রেম কাব্য রচিত হয়ে যাবে।

-আপনি আমায় সবটা খুলে বলুন। আমার জানা খুব জরুরী।যদি আপনার কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে আপনি কি আমার সাথে একটু দেখা করতে পারবেন?আমি সরাসরি আপনার কাছ থেকে সবটা শুনতে চাই।

-হুম অবশ্যই।আমার একটা ছোট্ট কাজ আছে ওটা শেষ করে আমি আসছি। আপনি আমাদের ভার্সিটির পাশের ক্যাফেতে চলে আসুন।

-আচ্ছা ঠিক আছে।আমি এখনি আসছি।


কলটা কেটে দিয়ে বের হলাম মুনের বান্ধবী তিন্নির সাথে দেখা করার জন্য।আজ এতদিন ধরে জমে থাকা সব প্রশ্নের উত্তর পাবো। আধঘন্টা পর তিন্নির দেওয়া ঠিকানায় পৌঁছে গেলাম।তিন্নি বসে আছে। সাথে একটা ছেলেও আছে। আমি ওদের কাছে যেতেই দুজনে সালাম দিলো।

-কেমন আছেন তিন্নি?

-আলহামদুলিল্লাহ ভালো। ভাইয়া আমি আপনার চেয়ে বয়সে ছোট তাই তুমি করে বলতে পারেন। আপনি আপনি করে বললে নিজেকে  বুড়ো মানুষ মনে হয়।

তিন্নির কথা শুনে আমরা দুজনে হেসে দিলাম। 

-ভাইয়া এ হলো তন্ময়। আমাদের আরেকটা ফ্রেন্ড। আমি, মুন আর তন্ময় খুব ভালো বন্ধু।

-ওহ আচ্ছা।


তন্ময়ের সাথে কথা বলতে বলতে কফির অর্ডার করলাম।

-তিন্নি আমি এতোক্ষণে বুঝতে পারলাম তোমরা খুব ভালো বন্ধু। তুমি ফোনে বলেছিলে ভালোবাসার মানুষ। আমার কাছে সবকিছু অস্পষ্ট। কেমন একটা অগোছালো।আমায় বলো সবটা।

-ভাইয়া মুন আপনাকে পাগলের মতো ভালোবাসে।একটা  মানুষ এতোটা ভালোবাসতে পারে তা মুনকে না দেখলে বুঝতাম না। আপনি অন্য কাউকে ভালোবাসতেন তাও মুনের ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না।

-আমি অন্য কাউকে ভালোবাসতাম এটা কে বলেছে?

তন্ময় বলে উঠলো,"আমি বলেছি ভাইয়া।"

-তোমরা কিভাবে জানলে?


তিন্নি বললো,"ভাইয়া আমি শুরু থেকে বলছি সব।প্রায় ৪ বছর আগের কথা।আমরা একদিন ক্লাস শেষে বাসায় ফিরছিলাম।গাড়ি পাইনি তাই হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিলাম। একবার কথা  শুরু হলে অন্যকিছুর দিকে খেয়াল থাকে না।হঠাৎ একটা ছেলের সাথে মুনের ধাক্কা লেগে যায়। মুন সরি বলতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকলো।কিন্তু ছেলেটা তাকায় নি। বিনয়ের সাথে সরি বলে চলে গেল। প্রথমবার মুন কোনো ছেলেকে এক দেখায় ভালোবেসে ফেলেছে। ছেলেটার নাম পরিচয় কিছুই জানা নেই। 

তন্ময় বলে উঠলো,"আমি ছেলেটাকে চিনতাম।মুন কথাটা শুনতেই ওর ব্যাপারে জানতে চাইলো।আমি বললাম,অনেক  বড় বিজনেসম্যানের ছেলে। পড়াশোনা শেষ করে বাবার বিজনেস সামলাচ্ছে।


মুন বললো--

-তন্ময় ওর ব্যাপারে আরো জানতে চাই। তুই খোঁজ খবর নে।

-কিছুদিন সময় লাগবে মুন। তিন দিনের মধ্যে ঐ ছেলের সমস্ত ইনফরমেশন মুনকে দিলাম।


তিন্নি----মুন রোজ ওই ছেলেটার অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো। একবার দেখার জন্য। অফিসের আশেপাশে অনেক মানুষ। তাই ছেলেটা বোধহয় বুঝতে পারে নি। কয়েকদিন পর তন্ময় খোঁজ আনলো ছেলেটার গার্লফ্রেন্ড আছে। কথাটা শুনে মুনের সে কি কান্না! খাওয়া দাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। ওকে বুঝিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে লাগলাম। আল্লাহর রহমতে মুন ঠিক হয়ে যায়।কিন্তু ছেলেটাকে ভুলতে পারে নি‌। রোজ ছেলেটাকে দেখার জন্য ছটফট করতো।


কিছুদিন পর তন্ময় ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিল যে ছেলেটার সাথে তার গার্লফ্রেন্ডের ব্রেকআপ হয়ে গেছে অনেক দিন। কথাটা শুনে মুনের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায়।মুন সেদিন বলল---"তিন্নি আমি তাকে ভালবাসি। কিন্তু আমি চাইনি কখনো ওর ভালোবাসার মানুষ ওকে ছেড়ে চলে যাক। ভালোবাসার মানুষের দেওয়া কষ্ট মৃত্যুর চেয়ে কম কিছু না। আমার অনেক খারাপ লাগছে। "


তন্ময়---"মুনকে সেদিন আমার পৃথিবীর সবচেয়ে মহান মানুষ মনে হলো। একটা মানুষ কতখানি ভালোবাসতে পারলে এমন কথা বলতে পারে।


তিন্নি---ভাইয়া তার ঠিক দুই মাস পর আপনার সাথে মুনের বিয়ে হয়। বিয়ের আগে মুন বলেছে একটা সারপ্রাইজ আছে আমাদের জন্য। বিয়ের আসরে আপনাকে দেখে আমরা খুব সারপ্রাইজড হয়ে গিয়েছিলাম। মুন কিছু বলে নি। বিয়ের পর সবটা বলবে বলেছে। কিন্তু তার তো কোনো খবরই নেই।তাই আজ কল দিলাম।


-ভাগ্যিস কলটা দিলে না হলে তো জানতে পারতাম না এতো কিছু। মুন যেমন মেয়ে কখনো বলতো না। অনেক ধন্যবাদ তোমাদের। অনেক বড় উপকার করলে। যে আমায় এতোটা ভালোবাসে তাকে আমি অবহেলা অযত্ন করে এসেছি। এতো দিন ধরে মুন অনেক কষ্ট সহ্য করেছে। আমি আর ওকে কষ্ট পেতে দেবো না। 


তন্ময়---ভাইয়া সেই মানুষটা আপনি।যাকে তিন্নি নিজের চেয়েও বেশি ভালবাসে। আপনি সেই মানুষ যার জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করে গেছে। ঝড় বৃষ্টি যাই হোক না কেন আপনাকে দেখার জন্য আপনার অফিসের সামনে ছুটে গেছে। একটাই অনুরোধ আপনি ওকে সবসময় হাসিখুশি রাখবেন। 


- সবসময় ভালো রাখবো।কোনো দুঃখ মুনকে ছুঁতে পারবে না। আমি মুনকে আমি একটা সারপ্রাইজ দিতে চাই তোমাদের একটা  হেল্প লাগবে।

-ভাইয়া আমরা আপনাকে সবরকম সাহায্য করতে রাজি।

-ঠিক আছে। শোনো তাহলে তোমরা মুনকে কল করে ডাকবে। আমিও থাকবো তবে আড়ালে। 

-ভাইয়া তিনদিন পর তো মুনের জন্মদিন। ওই দিন করলে কেমন হয়?

-ওয়াও তাহলে তো খুব ভালো। একদম সোনায় সোহাগা।এই জন্মদিনটাই আমাদের নতুন জীবনের শুরুর সূচনা হয়ে থাকবে।

বাসায় এসে দেখি মুন প্রচন্ড রেগে আছে।

-কোথায় গিয়েছিলেন রাশেদ?

-একটা কাজ ছিলো।

-কি কাজ? আপনার তো আজ ছুটি। কি এমন কাজ যাতে সকালে বের হয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতে হয়?ফোনে কল করলে পাওয়া যায় না?

-একটা জরুরি কাজের কথা মনে পড়ে গেল। আর ফোনটা যে কখন সাইলেন্ট হয়ে গেছে বুঝতে পারিনি।

-আপনি কি কিছু লুকাচ্ছেন আমার থেকে?

-কি যে বলেন আপনি মুন!!!আমরা তো ফ্রেন্ড। ফ্রেন্ডের থেকে কিছু লুকানো ঠিক নয় আমি জানি।

-না লুকালেই ভালো। ফ্রেশ হয়ে আসুন। খাবার দিচ্ছি।

-আপনি না খেয়ে আছেন কেন শুনি?

-হুহ বয়ে গেছে আমার না খেয়ে থাকতে।

-মিথ্যে কথা বলতে পারেন তবে বলেছেন কেন? নয়না খালা আমায় বলেছে। আপনি কিছু খান নি।

-আমায় নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তাড়াতাড়ি আসুন।


খাবার টেবিলে গিয়ে দেখি মুন খাবার নিয়ে বসে আছে‌।আমি চেয়ার টেনে বসলাম। 

-আপনি খেয়ে নিন আমি আম্মুর ওষুধ দিয়ে আসি।

-কোথাও যাবেন না। আমার পাশে বসুন।

-ঔষধ খাওয়ার টাইম হয়ে গেছে না দিলে জানেনই তো শরীরটা আবার খারাপ হয়ে যাবে।

-নয়না খালা আম্মুর ঔষধ টা দিয়ে আসো তো। এবার বসুন।

-ভাত মেখে মুনের সামনে ধরলাম,"হা করুন"

-আমি খাবো না।


একটু রাগের ভান করে বললাম,"খেতে বলেছি চুপচাপ খাবেন।কোনো কথা শুনতে চাই না।"

মুন বাচ্চাদের মতো চুপ করে খেয়ে নিলো।মনে মনে হেসে বললাম যাক রাগটা কাজে দিয়েছে।

------------------------------------------------------------


তিনদিনের অপেক্ষা শেষে সেই দিনটা এলো। তিন্নি আর তন্ময় মুনের জন্য অপেক্ষা করছে।। মুনকে বলেছি অফিসে আজ অনেক কাজ। বাসায় ফিরতে দেরি হবে।আমি মুনের আগেই এসে আড়ালে  বসে আছি। এমন জায়গায় বসেছি যেন ওদের সবকথা শুনতে পাই আর মুনের কোনো সন্দেহ না হয়।কিন্তু মুন এখনো আসছে না। হঠাৎ তিন্নির ফোনে একটা কল আসলো..........



***চলবে***


Easin Arafat

Easin

দয়া করে স্পাম করা থেকে বিরত থাকুন।

نموذج الاتصال