প্রাক্তন (পর্ব ০৩)মিশিতা চৌধুরী
ঋতুর হাত টা ধরে বললাম, "ঋতু আমি তোমাকে কিছু কথা বলার জন্য ডেকেছি। অনেক দিন ধরে বলবো বলবো ভাবছি কিন্তু তুমি ব্যাপারটা কিভাবে নেবে তাই আর বলা হয়ে ওঠে নি।"
ঋতু মুচকি হেসে বললো,"রাশেদ তুমি এতো আমতা আমতা করছো কেন? তুমি আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলো। আচ্ছা তুমি কাউকে ভালো টালো বাসোনি তো আবার!!
-খানিকটা তাই ঘটেছে।
-ওয়াও তাহলে তো খুব ভালো। তা মেয়েটা কে? নাম কি? কেমন দেখতে? আচ্ছা তুমি আমায় আগে কেন বলো নি?
-ওরে আল্লাহ। এত্তোগুলা প্রশ্ন!!!
-হাহাহা হুম হুম। একটা একটা করে বলো।
-আসলে ওর সাথে আমার রোজ কথা হয়। মেয়েটা দেখতে এতোটাই মিষ্টি না ভালোবেসে থাকা যায় না । একটা অদ্ভুত রকমের ভালো লাগা কাজ করে।
-বাপরে। কোন সে মায়াবতী মেয়ে যাকে দেখে আমার বন্ধুর মনে ভালোবাসার লাড্ডু ফুটেছে। তা মশাই আপনার সে সখীর সাথে কবে দেখা করাবেন শুনি?
-এখনো তাকে বলতে পারি নি। ও আশেপাশে থাকলে হার্টবিট বেড়ে যায়।
ঋতু হো হো করে হেসে উঠে বললো, এই ব্যাপার। এখনো প্রপোজ করো নি?
-আজ করবো ভাবছি।
ঋতু অবাক হয়ে বললো,"আজ সে আসবে? ওয়ান্ডারফুল সারপ্রাইজ রাশেদ।" আমি তোমার এই স্পেশাল মূহুর্তে থাকতে পারছি। খুব ভালো লাগছে।কখন আসবে?
আমি হাঁটু গেড়ে ঋতুর সামনে বললাম, "প্রপোজ কিভাবে করতে হয় আমি জানি না। কিভাবে ভালোবাসতে হয় জানি না। শুধু জানি তুমি ছাড়া আমি নিঃস্ব। তুমি আমার আশেপাশে থাকলে আমার খুব ভালো লাগে। নিজের ভালো থাকার জন্য আমি তোমাকে চাই। আমি হয়তো অন্য প্রেমিকের মতো নিরানব্বই হাজার নয়শত নিরানব্বই টা গোলাপের পাপড়ির গালিচায় হাঁটাতে পারবো না। কিন্তু অসংখ্য শিরা উপশিরা দ্ধারা তৈরি হার্টবিটের যতগুলো বিট হবে ততবার ভালোবাসবো। ঋতু আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে চাই। তুমি কি এই গরীব মানুষের ভালোবাসা গ্ৰহণ করবে? অগোছালো জীবনকে সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে তোলার দায়িত্ব নিতে পারবে। আমার নির্ঘুম রাতের সঙ্গী হবে?"
ঋতু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,এসব তুমি কি বলছো রাশেদ? তুমি আমার সাথে মজা করছো তাই না? তুমি ও না এতো মজা করতে পারো। খুব ফাজিল হয়েছো। দাঁড়াও ভাবীকে বিচার দেবো।
-আমি মজা করছি না। তুমি সেই মেয়ে যাকে আমি ভালোবাসি। আমার ড্রিম গার্ল।
-রাশেদ আমার মনে হয় তুমি ঠিক নেই । অনেক ঘুরাঘরি করেছো তাই ক্লান্ত হয়ে গেছো। এবার আমাদের বাসায় ফেরা উচিত।
-আমি তোমায় জোর করবো না। আমি শুধু আমার অনুভূতি গুলো প্রকাশ করেছি। তুমি ভেবে উত্তর দিও । তাড়াহুড়ো নেই কোনো। অনেক সময় আছে।
-আমি আসছি রাশেদ।
সেদিন ঋতু চলে গেছে কোনো উত্তর না দিয়ে। বাসায় গিয়ে ছোট্ট একটা মেসেজ, "আমি পৌঁছে গেছি"।
সেদিন থেকে ঋতু আমার সাথে কথা বলা কমিয়ে দিলো। তিন/চার দিন পর পর মেসেজের রিপ্লাই দেয়। আমি ওকে খুব মিস করতে থাকি। নিজেকে পাগল পাগল মনে হতে লাগলো। এভাবে কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। একদিন ঋতুকে বললাম,"তুমি কি আমার ওপর রেগে আছো?"
-না ।
-আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো ।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। নিরবতা ভেঙ্গে বলে উঠলো-
-রাশেদ তোমাকে কিছু বলতে চাই। আমার মনে হয় আমাদের এই বিষয়ে আরো কথা বলা দরকার। তুমি কি একবার আসতে পারবে?
- হুম কবে আসবো।
-তোমার যেদিন সুবিধে হবে।
-ঠিক আছে। আজ মঙ্গলবার।আমি বৃহস্পতিবার তোমার সাথে দেখা করব।
-হুম ওকে।
---------------------------------------------------------
বৃহস্পতিবারে ঋতুর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। গিয়ে দেখি সে অপেক্ষা করছে। পাশে গিয়ে বসলাম।
-কেমন আছো?
-ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
-হুম ভালো। রাশেদ তোমায় কিছু কথা বলার জন্য ডেকেছি। জানি না তুমি কিভাবে নেবে কথাগুলো কিন্তু আমার মনে হয় তোমাকে সবটা বলা উচিত।
ঋতুর কথা শুনে হৃদয় টা কেঁপে উঠলো। কি বলবে ! খারাপ কিছু না তো!
ঋতু বলে উঠলো,"দেখো রাশেদ তুমি আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। যাকে মনের ভেতরে থাকা জমানো কথাগুলো, অনুভূতিগুলো অনায়াসে কোনো দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছাড়াই বলা যায়। আমি তোমাকে আমার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ মনে করি। কিন্তু সেটা শুধু বন্ধু হিসেবে। তোমাকে প্রেমিক হিসেবে কখনো আমি চিন্তা করি নি। কিছু কিছু মানুষকে শুধু একটা বিশেষ স্থানে মানায়। অন্য কোনো জায়গায় বেমানান মনে হয়। ঠিক তেমনই তুমি শুধু আমার প্রিয় বন্ধু। অন্য কোনো সম্পর্কে তোমায় ভাবতে পারি না।
ঋতুর কথাগুলো শুনে বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয়ে যাচ্ছিলো।মনে হচ্ছিল কেউ যেন হৃদপিন্ডটা কেটে নিচ্ছে। ঋতু আবার বলতে লাগলো--
-আমি জানি তুমি আমায় খুব ভালোবাসো। আমি ভেবেছিলাম সেটা শুধু বন্ধু হিসেবে। হুমায়ূন আহমেদের সেই উক্তিটি এভাবে সত্যতায় পরিণত হবে আমি চিন্তা করতে পারি নি। তুমি খুব ভালো একটা মানুষ। তুমি আমার চেয়েও ভালো কাউকে ডির্জাভ করো।
-আমার ভালো কাউকে চাই না। তোমায় লাগবে। প্লিজ আমায় ছেড়ে যেও না। আমি তোমায় ছাড়া থাকতে পারবো না।
-রাশেদ তুমি চাইলে আমি তোমার বন্ধু হয়ে সারাজীবন থাকবো। তুমি যেমন আমায় ভালোবাসো ঠিক তেমনি..........
প্রাক্তন (পর্ব ০৪)
তুমি যেমন আমায় ভালোবাসো ঠিক তেমনি আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। তোমার সাথে পরিচয় হওয়ার আগে ওর সাথে আমার পরিচয় হয়। তারপর বন্ধুত্ব । ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব টা ভালোবাসায় পরিণত হয়। তুমি কখনও আমায় জিজ্ঞেস করো নি তাই নিজ থেকে আমিও কিছু বলি নি। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হবে কখনো কল্পনা করিনি। যদি একটুও আচঁ করতে পারতাম তবে অনেক আগেই তোমায় সবটা বলতাম।
ঋতুর কথাগুলো শুনে নিজেকে ছোট মনে হতে লাগলো। আমার সবকিছু জেনে নেওয়া উচিত ছিল। এভাবে হুট করে বলা ঠিক হয়নি।ঋতুকে বললাম,
-সরি ঋতু। আমি যদি জানতাম তবে কখনোই তোমায় আমার অনুভূতিগুলো বলতাম না। আমায় মাফ করে দাও।
-এমন করে কেন বলছো।আমরা দুজনেই পরিস্থিতির স্বীকার।
-হুম। আচ্ছা তোমার বয়ফ্রেন্ড কি করে? ও কেমন দেখতে?নাম কি?
-ওর নাম শিশির।ও উচ্চ শিক্ষার জন্য আমেরিকা গেছে
পাঁচ বছর আগে। পড়াশোনা শেষ করে ওখানকার একটা কোম্পানিতে চাকরি করে।প্রত্যেক বছর আসে কিছুদিন থেকে আবার চলে যায়। আগামী বছর ও একেবারের জন্য চলে আসবে দেশে।
-ওহ আচ্ছা। বিয়ে করবে কবে?
-এখনো জানি না।ওর ফ্যামিলির সবাই জানে আমাদের রিলেশনশিপের ব্যাপারটা কিন্তু আমার ফ্যামিলির কাউকে কিছু জানাই নি। আগে পড়াশুনা শেষ করে একটা চাকরি পাই তারপর বিয়ে নিয়ে ভাববো।
-ওহ আচ্ছা। আমি খুব লজ্জিত।
-প্লিজ রাশেদ এভাবে বলো না।
-ঋতু
-হুম বলো।
-তুমি কি আমার উপর রাগ করে বন্ধুত্বটা ভেঙ্গে দেবে?প্লিজ এমনটা করো না।
-রাশেদ তুমি চাইলে আমি সারাজীবন তোমার ভালো বন্ধু হয়ে থাকবো।
-সত্যি বলছো?
-হুম।
-একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
-তুমি এতো ফরম্যালিটি কেন করছো? বলে ফেলো।
-কখনো সে যদি ছেড়ে যায় কি করবে?
-মানুষের মন বড্ড অবুঝ। মনের উপর কারোর হাত থাকে না। যদি এমনটা হয় তবে নির্দ্বিধায় যেতে দেবো। ভালোবাসা ধূসর হয়ে গেলে অধিকার দেখানো বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। আমি খুব স্বার্থপর। আমার প্রিয় মানুষটিকে কারোর সাথে ভাগ করতে পারবো না।যদি সে আমার হয় তবে পুরোপুরি আমার। বিন্দু পরিমাণ অন্য কারোর হলে আমি তাকে ছেড়ে দিতে এক সেকেন্ড ভাববো না।
-হুম।
- আম্মু কল দিচ্ছে তাড়াতাড়ি বাসায় যাওয়ার জন্য।চলো বাসায় যাই।
-হুম চলো।
বাসায় এসে দরজা লাগিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম। ঋতু যখন কথাগুলো বলছিল তখন দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছিলাম।যার জন্য একটু একটু করে এতো যত্নে ভালোবাসা লালন করছিলাম সে অন্য কারোর ভালোবাসায় সিক্ত। কি হতো আমায় একটু ভালোবাসলে। হয়তো আমি তাকে পাওয়ার যোগ্য নই।
--------------------------------------------------------------
এভাবে কিছু মাস কেটে গেল। ঋতুর সাথে এখনও কথা হয় তবে বন্ধু হিসেবে। অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি হঠাৎ আম্মু এসে বললো-
-রাশেদ বাবা।
-হুম আম্মু বলো।
- তোকে একটা জরুরী কথা বলার জন্য এসেছি।আমি আর তোর বাবা মিলে ঠিক করেছি তোর বিয়ে দিয়ে একটা টুকটুকে বৌমা ঘরে নিয়ে আসবো।
-আম্মু আমি এখন এসবের জন্য প্রস্তুত নই। বিয়ে টিয়ে আমার দ্বারা হবে না। আর তুমি তো জানো আজকালকার মেয়েরা কেমন!!
-সব মেয়ে সমান নয় বাবা। পৃথিবীটা ভালো মন্দ মিলিয়ে মিশিয়ে গড়া। ভালোর পাশাপাশি যদি খারাপটা না থাকতো তবে আমরা ভালো মন্দের ফারাক বুঝতে পারতাম না। মন্দ আছে বলেই ভালো এতো মূল্যবান।
-হুম। কিন্তু আমার ওসব ঝামেলা মনে হয়। তুমি আমি আর বাবা মিলে বেশ তো আছি।প্লিজ আম্মু আমি বিয়ে করছি না এটাই ফাইনাল।
-এটাই তোর শেষ কথা?
-হুম। ঠিক আছে তাহলে আমার দুই চোখ যেদিকে যায় আমি চলে যাব।
-কেন ছেলেমানুষী করছো আম্মু!
শুধু আম্মু না , তুই যদি বিয়ের করতে রাজি না হোস তবে আমিও একই কাজ করবো।
-বাবা তুমিও শুরু করলে?
-হ্যাঁ করলাম। ছেলেমেয়েরা অবাধ্য হলে এসব করা ছাড়া উপায় নেই।
-রাশেদ বাবা রাজি হয়ে যা না বাবা। প্লিজ বাবা তুই না করিস না। মায়ের শেষ ইচ্ছেটা তুই রাখবি না?
-ঠিক আছে।
-সত্যি বলছিস বাবা?
-হুম।
-তোর কোনো পছন্দের মেয়ে আছে?থাকলে বল।
-না মা কেউ নেই।
-আচ্ছা তবে আমরা আমাদের মতো দেখাদেখি শুরু করি। রাশেদের বাবা ঘটককে খবর দাও।
-এক্ষুণি দিচ্ছি।
সেদিনের মত অফিসে বেরিয়ে গেলাম। নিজের ভেতর চাপা আর্তনাদগুলো খুবলে খুবলে খাচ্ছে। কিচ্ছু করার নেই। যাকে ভালোবাসি সে আমার নয়। চোখগুলো ভিজে গেছে। কাউকে বোঝাতে পারছি না। মনপাজরে যাকে আগলে রেখেছি তাকে ভুলে কিভাবে নতুন ঠিকানায় পা বাড়াবো। অজস্র প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে থমকে গেলাম। আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস আছে। তিনি যা করবেন ভালোর জন্য করবেন।
------------------------------------------------------------------
এর কয়েকদিন পর------
-রাশেদ তোকে যে কয়েকটা মেয়ের ছবি দিলাম দেখেছিস?
-মা আমার এসব ভালো লাগে না। তোমরা করো না তোমাদের মতো। আমায় প্লিজ এসবের মধ্যে রেখো না।
-বাবা কয়েকদিন ধরে দেখছি তোর চোখ মুখ কেমন ফ্যাকাশে। আগের মতো কথা বলিস না। কেমন যেনো শান্ত হয়ে গেছিস। কি হয়েছে তোর?
-না আম্মু আমি তো ঠিকই আছি। কিচ্ছু হয় নি।
-আমায় মিথ্যা বলিস না বাবা।কি হয়েছে সবটা বল আমায়।
-অফিসের কাজে একটু চাপ ঐজন্য এমন লাগছে। তুমি ভেবো না ঠিক হয়ে যাবে।
-মায়ের চোখ ফাঁকি দেওয়া যায় না বাবা। ঋতু কে?
-ঋতু!!!! তুমি কিভাবে জানলে এই নামটা?
-কিভাবে জেনেছি সেটা বড় কথা নয়। কে সে বল আমায়?
-আমার একটা ভালো বন্ধু।
-শুধুই বন্ধু। নাকি এর চেয়ে বেশি কিছু?
-কি যে বলো না!
-কাল রাতে তোর ডায়েরি টা খোলা রেখে ঘুমিয়ে গিয়েছিলি। সেখান থেকে জানতে পারলাম। সরি বাবা না বলে তোর ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দিয়েছি।
-আম্মু আমার সব কিছুতে তোমার অধিকার রয়েছে।
-হুম। কে ওই মেয়েটা?
আম্মুকে বলতে লাগলাম সবটা।আম্মুর চোখে পানি চলে এসছে।আম্মুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলাম। এতো দিন ধরে লুকানো যন্ত্রণাগুলো যেন বের হয়ে আসতে লাগলো।
-কান্না করিস না বাবা। কালই আমি ওই মেয়ের বাসায় যাবো......
(আসসালামুয়ালাইকুম। কেমন আছেন সবাই? কেমন লাগছে গল্পটা প্লিজ কমেন্টে জানাবেন😊)
