![]() |
| চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০৫ ) |
চন্দ্রাবতী ( পর্ব ০৫ )মিশিতা চৌধুরী
"চন্দ্রা তুই কি জানিস তোর নাম চন্দ্রা কেন রেখেছিলাম?
"কেন আম্মু?"
"তুই যেদিন হয়েছিলি সেদিন চাঁদের আলোটা অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। তোর বাবা বলেছিল তোর নাম চাঁদনী অথবা চন্দ্রা রাখার জন্য। আমার চন্দ্রা নামটা বেশি ভালো লাগলো।চন্দ্র মানে চাঁদ। চাঁদ যেমন সূর্যের আলো নিয়ে নিজেকে উজ্জ্বীবিত করে। অন্ধকারে আলো ছড়িয়ে দেয়।ঠিক তেমনি করে তুই আমার এই শরীরের প্রতিটা অংশের শক্তি নিয়ে এই পৃথিবীর আলো দেখেছিস।আমি আমার মধ্যে থাকা প্রত্যেকটা গুন তোকে দেওয়ার চেষ্টা করে গিয়েছি। এবার তোর পালা। তোকেও ঐ দূর আকাশের চাঁদের মতো নির্ভয়ে এগিয়ে যেতে হবে। পারবি না মা পুরনো সব খারাপ স্মৃতিকে ভুলে গিয়ে একটা নতুন মানুষ হয়ে উঠতে। আমি বলছি না তুই পরিবর্তন হ। তুই যেমন আছিস একদম ঠিক আছিস। শুধু নিজের ভেতরে থাকা প্রত্যেকটা গুনগুলো খুঁজে বের করে নিজেকে প্রকাশ কর।
"আম্মু আমার বড্ড ভয় করছে"
"আমার চন্দ্রা তো ভীতু নয়। আমি সবসময় তোর পাশে আছি।আজ থেকে ভেবে নে আমি তোর বন্ধু!"
আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
"তুমি পাশে থাকলে আমি সব বাধা পার করতে পারবো।"
"তুই এবার একটু রেস্ট নে।আমি আজ তোর সব পছন্দের রান্না করবো"
আম্মু রান্না ঘরে চলে গেল।আমি আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভাবছি। ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখটা লেগে গেল বুঝতে পারি নি। ঘুম থেকে উঠে দেখি আম্মু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
"কিরে উঠে পড়লি কেন? এতো তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙ্গে গেল? আচ্ছা যা হাত মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে আয়।"
হাত মুখ ধুতে গিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। চোখগুলো কেমন ফুলে লাল হয়ে আছে। আরেক দফা কান্না করে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
"এতোক্ষণ লাগে হাত মুখ ধুতে। খাবারগুলো সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। বস তাড়াতাড়ি।"
প্লেটে খাবার বাড়তে বাড়তে আম্মু ছোট বেলার গল্প বলতে লাগলো। বুঝতে পারছি আম্মু আমার মন ভালো করার চেষ্টা করছে। আমার আড়ালে সন্তর্পণে নিজের চোখের পানি মুছে নিচ্ছে।
--নে খাওয়া শুরু কর। তোর সবচেয়ে প্রিয় খাবার খিচুড়ি ইলিশ মাছ ভাজা আর চিংড়ির চচ্চড়ি।
--আম্মু আজ আমায় খাইয়ে দেবে গো।যেমন ছোট বেলায় দিতে।
--ঠিক আছে মা দিচ্ছি।
কয়েক লোকমা খাওয়ার পর আর খেতে ইচ্ছে করছিল না।ঐ বাসার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সবাই কতো মজা করতো খাবার টেবিলে।
"খাওয়ার সময় চোখের পানি ফেলতে নেই"
আম্মুর কথায় বাস্তবে ফিরে এলাম।
--"আর খাবো না আম্মু।"
--ঠিক আছে মুখ মুছে নে।
আমি আম্মুর আঁচলে মুখ মুছে বারান্দায় গেলাম।আম্মু দু'কাপ চা নিয়ে আসলো।
--চা টা খেয়ে বলতো কেমন হয়েছে?
এক চুমুক দিয়ে বললাম, বরাবরের মতো খুব মজা।আমার যখনই মন খারাপ থাকতো তখনই আম্মু এমন করতো। বারান্দায় বসে দুজনে অনেক গল্প করলাম।
--অনেক রাত হয়েছে চল এবার ঘুমাতে যাবি।
--ঘুম আসছে না।
--আমি ঘুম পাড়িয়ে দেবো।না ঘুমালে শরীর খারাপ করবে।
আম্মু জোর করে ঘুমাতে নিয়ে গেল।আমি চোখ বন্ধ করে রাখলাম।আম্মু মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছিলো। ভোর বেলায় আযানের শব্দে ঘুম ভাঙলো। নামাজ পড়ে একটু হাঁটতে বের হলাম। হাঁটতে হাঁটতে নদীর পাড়ে চলে এসছি। খুব সুন্দর পরিবেশ।কিছুটা শান্তি লাগছিল।হঠাৎ চন্দ্রা বলে কেউ ডাক দিলো। আশেপাশে কাউকে দেখতে পেলাম না। একটু পর আবার ও আমায় কেউ ডেকে উঠলো। পিছন ফিরে তাকাতে দেখি স্কুলের প্রিন্সিপাল ম্যাম। উনি আমায় খুব স্নেহ করেন।আমি এগিয়ে এসে সালাম দিলাম।
--কতদিন পর তোমার সাথে দেখা হলো। কেমন আছো?
--জি ম্যাম ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
--আর ভালো থাকা সংসার,স্কুল নিয়ে খারাপ অবস্থা।যেদিক টা দেখবো না সেদিকটা একবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। তুমি যখন ছিলে তখন সবটা সুন্দরভাবে হয়ে যেত। তুমি যাওয়ার পর সবটা আমাকে সামলাতে হচ্ছে। নতুন স্কুলের কাজ চলছে।সাথে নাম ও পরিবর্তন হচ্ছে।কিছুদিনের মধ্যে ওখানে সব শিফট করে নেবো। তুমি থাকলে খুব ভালো হতো। বাচ্চাদের খুব সহজভাবে বোঝাতে পারো। আমরা সবাই তোমাকে খুব মিস করি।
--আমিও আপনাদের খুব মিস করি।
--একদিন তোমার স্বামীকে নিয়ে বাসায় এসো। দেখো বের হয়েও শান্তি নেই তোমার স্যার কল দিচ্ছে। বার বার।সময় পেলে স্কুলে এসে ঘুরে যেও।আমি আসছি এখন।
ম্যামকে বিদায় দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
"সবাই আমাকে মিস করে ,ভালোবাসে কিন্তু যার ভালোবাসা আমার বেঁচে থাকার কারন সে মানুষটাই আমায় দূরে সরিয়ে দিলো।তার কাছে আমার কোনো মূল্য নেই।"
বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক বেলা হয়ে গেছে। ভেতরে ঢুকতে দেখি আম্মু রিমার সাথে কথা বলছে।আমায় দেখে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল।
--ভাবী তুমি আমায় এসব জানাও নি কেন? তোমায় কতো বার কল দিয়েছি জানো!! আমি কি তোমার কেউ নই বলো?ভাইয়া তোমার সাথে এতো বড় অন্যায় করছে আর তুমি ওকে এমনি এমনি ছেড়ে দিলে!
--দূর পাগল মেয়ে জোর করে থাকা যায় কিন্তু ভালোবাসা পাওয়া যায় না। তোমার ভাইয়ার মন জুড়ে অন্য কেউ বিরাজ করে সেখানে আমি কি করে থাকি বলো?
--ভাবী তুমি ওই অমানুষের কথা একদম ভাববে না।ও একটা নিকৃষ্ট লোক। ওকে আমার ভাইয়া বলতে ঘৃনা করে।
--এমন বলো না রিমা।ও তোমার বয়সে বড় হয়। গুরুজনের নামে খারাপ কথা বলা ঠিক না।মা বাবা কেমন আছেন?
--তোমায় ছাড়া আমরা কেউ ভালো নেই।
রিমা কান্না করতে লাগলো। দুঃসময়ে বোঝা যায় কারা আপন কারা পর। আমি ও বুঝতে পেরেছি এই মানুষগুলো আমায় কতখানি ভালোবাসে কোনো স্বার্থ ছাড়াই।
--ভাবী তোমার যেকোনো প্রয়োজনে আমায় ফোন করবে।মনে রেখো তোমার এই ছোট বোন সবসময় তোমার পাশে আছে। তুমি আমায় ভুলে যেও না ভাবী।
--এমন মিষ্টি একটা বোনকে ভোলা যায় না কি। কখনো ভুলবো।
-- ভাবী তুমি ওই বাড়িতে ফোন রেখে এসেছে কেন? তুমি ফোনটা নিয়ে আসলে না কেন?ওটা তো বাবা দিয়েছিল।
--তোমার ভাইয়ার বৌয়ের পরিচয়ে ও বাড়িতে আমি ঐ বাসায় প্রবেশ করি ।সেই পরিচয়টাই যখন নেই তখন বাকি সব দিয়ে কি করবো বলো!
--হুম। বুঝতে পেরেছি।ভাবী আজ আমায় যেতে হবে।রাফাতের শরীরটা ভালো নেই।ওকে একা। রেখে এসেছি।
--কি হয়েছে রাফাত ভাইয়ের?
--তেমন কিছু না।ওই জ্বর সর্দি কাশি এসব।
--আচ্ছা সাবধানে যেও। পৌঁছে আম্মুর ফোনে একটা কল বা মেসেজ করো।
--ঠিক আছে ভাবী। আমি আবার আসবো।
রিমা চলে গেল।আমি রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিলাম। শরীরটা খুব দুর্বল লাগছে।এমন সময় আয়াত এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার বুকে।
"ফুফিমনি। আমি এসে গেছি।"
"আয়াত সোনা।"
আয়াতকে জড়িয়ে ধরলাম। আয়াত আমায় খুব ভালোবাসে।
"জানো তোমার সাথে কত্তগল্প বাকি আছে।"
--আয়াত তুমি এখন দাদুনের সাথে গল্প করো।আমি তোমার ফুফিমনির সাথে একটু কথা বলি।
দরজার দিকে তাকাতে দেখি ভাইয়া ভাবী দাঁড়িয়ে আছে।আয়াত চলে গেল। ভাইয়া ভাবী দুজনে বিছানায় বসলো। ভাইয়া বলল, চন্দ্রা যা হয়েছে তাতে তোর কোনো দোষ নেই।তাই নিজেকে কখনো অপরাধী ভাববি না। সবসময় মনে রাখবি তোর ভাই তোর সাথে আছে।"
--তোমার ভাইয়া ঠিক বলেছে। তুমি একা নও আমরা সবাই তোমার পাশে আছি। শোনো ফায়াজ তুমি ওদের সাথে কথা বলে দেনা পাওনার ব্যাপারটা মিটিয়ে নাও।ডির্ভোস হওয়ার আগে সব বুঝে নিতে হবে। নইলে পরে যদি অস্বীকার করে!!
--ভাবী আমি ওদের থেকে এক পয়সাও নেবো না।
--একি বলছো!এটা তোমার হক।
--ঠিক বলেছি। ভাইয়া তুমি এই ব্যাপারে ওদের সাথে কথা বলবে না।
--চন্দ্রা যা বলছে তাই হবে আঁখি। জীবনটা ওর।ও ঠিক করুক কি চায়।ঠিক আছে তুই এখন রেস্ট নে।আমরা যাচ্ছি।
আমার কথাটা শুনে ভাবীর মুখটা অন্যরকম হয়ে গেছে। কথাটা মনে হয় পছন্দ হয়নি।
দুপুরের খাবার টেবিলেও ভাবী চুপচাপ ছিলো।কোনো কথা বলে নি। ভাইয়া আর ভাবী আগে খেয়ে রুমে চলে গেল। খাওয়া দাওয়া শেষ হওয়ার পর আম্মু সব গুছিয়ে রাখছিল।আমি আম্মুকে একটু সাহায্য করে রুমে আসছিলাম।তখন ভাইয়ার রুম থেকে
চাপা চিৎকার হচ্ছিল।
--শোনো ফায়াজ তোমার বোন যা বলছে ঠিক বলছে না। ওদের এমনি এমনি ছেড়ে দেবে কেন?
--তুমি এই বিষয়ে চুপ থাকো।
--আমি চুপ থাকবো না। সারাজীবনের জন্য আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে।তার উপর টাকা পয়সা ও নেবে না। তোমার এই কটা টাকায় এতো গুলো মানুষ চলবে কিভাবে ভেবে দেখেছো। আয়াত বড় হচ্ছে ওর পড়াশোনার খরচ বাড়ছে। আমার মেয়ের ভবিষ্যতের কথা তো আমায় ভাবতে হবে তাই না!!
আর তুমি বলছো চুপ থাকতে।ক্ষমা করো আমি পারবো না সেটা।
--আমার বোন মাত্র দুদিন হলো এসছে।তাতেই তুমি এমন শুরু করে দিচ্ছ।এর ফল কিন্তু ভালো হবে না।আচ্ছা এমন যদি তোমার বোনের সাথে হতো তবে তুমি কি তার দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারতে? আমার বোন সারাজীবন আমার টাকায় খাবে পড়বে। তোমার যদি না পোষায় তবে তুমি তোমার পথ বেছে নাও।আমি আমার বোনের দায়িত্ব পালন করবো।
ভাইয়া ঘর ছেড়ে বেরিয়ে......
***চলবে***
