![]() |
| চন্দ্রাবতী ( পর্ব ১২ ) |
চন্দ্রাবতী ( পর্ব ১২ )মিশিতা চৌধুরী
চন্দ্রার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ অনুর একটা মেসেজ আসলো। মেসেজটা দেখে চন্দ্রা নীলের রুমের দিকে গেল।
"স্যার আসবো?"
"জি আসুন।"
"স্যার আমার পাঁচ দিন ছুটি লাগবে।"
"কেন?"
"স্যার আমার ফ্রেন্ডের বিয়ে।ওর মা বাবা চাইছে বিয়েটা গ্রামে হোক।ওই জন্য।"
"ওহ আচ্ছা।ঠিক আছে আপনি একটা দরখাস্ত লিখে জমা দেন যেহেতু অনেক দিনের ছুটি।"
"ঠিক আছে স্যার।"
চন্দ্রা কেবিনে গিয়ে দরখাস্ত লিখে রাখলো।
"এখন আর স্যারকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না। দরখাস্তটা বরং লাঞ্চের সময় গিয়ে দিয়ে আসবো।"
দরখাস্তটা এক পাশে রেখে চন্দ্রা তার কাজ করতে লাগলো। লাঞ্চের সময় চন্দ্রা নীলের রুমে গেল। গিয়ে দেখে বৃষ্টি আর নীল একসাথে লাঞ্চ করছে।
"স্যার ছুটির দরখাস্তটা।"
"টেবিলের উপর রাখুন।"
"জি স্যার।"
চন্দ্রা টেবিলের উপর খামটা রেখে চলে আসছিল।
"চন্দ্রা আপনি খেয়েছেন?"
"না স্যার।"
"ঠিক আছে খেয়ে তারপর বাকি কাজ করবেন।"
বৃষ্টি বলল,"নীল আমার কিছু শপিং করতে হবে। তুমি আমার সাথে যাবে?"
"ঠিক আছে ম্যাডাম যাবো।"
চন্দ্রা কেবিনে এসে ধপ করে বসে পড়লো।
"নীল স্যার আমাকে আপনি করে বলছে!ভালোই হয়েছে। আমাকে আর বিরক্ত করবে না। নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবো।"
পরের দিন বিকালে সবাই মিলে অনুদের গ্ৰামের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। অনেকদিন পর গ্ৰামে যাচ্ছে সবাই।আগে কখনো গ্ৰামে আসেনি তাই আয়াত প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করেই চলেছে।সবাই মিলে হই হই করতে করতে তিন ঘণ্টা পর গ্ৰামে পৌছায়।অনুর বাবা মা বিয়ের কাজ করার জন্য কয়েকদিন আগেই চলে এসছে। ওরা আসতেই অনুর চাচাতো বোনেরা গল্প করতে এলো।অনুর মা বলল,"শোন সবাই ওদের এখন কেউ বিরক্ত করবে না।ওরা এসছে খাওয়া দাওয়া করে রেস্ট নিবে। রাতে যার যা ইচ্ছে করবে। এখন সবাই ঘরে যাও আমি খাবার পাঠাচ্ছি।"
সবাই হালকা খাবার খেয়ে নিয়ে বিশ্রাম নিলো। ঘন্টাখানেক পর চন্দ্রা বলল,"এই অনু চল না আশপাশে একটু ঘুরে আসি।"
"হুম চল"
চন্দ্রা অনু আর ওর চাচাতো বোন তানহা আর মিম মিলে গ্ৰামটা ঘুরতে বের হলো। রাতের বেলায় অন্ধকারে ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না।তাই বেশিদূর না গিয়ে ফিরে এলো। বাসায় এসে দেখে নীলাশা, মিসেস সাবিনা আর আরশি বসে আসে। চন্দ্রাকে দেখে আরশি দৌড়ে এলো।
"ফুফিমনি তুমি এসেছো!"
"হ্যাঁ সোনা।"
মিসেস সাবিনা এসে বলল,"তোমার সাথে এভাবে দেখা হবে ভাবতেই পারিনি।"
"আসলে আন্টি অনু অনেক জোরাজুরি করেছে তাই এসেছি।"
"খুব ভালো করেছ মা।নীলাশা আমায় বলেছে। খুব খুশি হয়েছি আমি।"
অনু বলল,"নীল ভাইয়া আসে নি?"
নীলের কথা উঠতেই চন্দ্রার মুখটা শুকিয়ে গেল।নীলাশা বলল,"ওরা আসছে রাস্তায় আছে!"
"নীল ভাইয়ার সাথে আর কেউ আসছে?"
"হুম আমার মামাতো বোন বৃষ্টিও আসছে।"
"বাহ বৃষ্টি আপুও এসেছে।আর ওর স্বা....."
নীলাশা তাড়া দিয়ে বলে উঠলো,"চল সবাই আমরা কোনদিন কি পরবো ঠিক করে নেই।পরে সময় পাবো না।"
আরশি বলল,"মাম্মা আমি আর আয়াত খেলতে যাই?"
"যাও সোনা তবে দুষ্টুমি করবে না।"
চন্দ্রা নীলাশা আর অনু রুমে চলে গেল।ওরা কে কি পরবে তা ঠিক করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেছে।অনুর মা খেতে ডাকলো।সবাই খেতে বসে পড়লো।এমন সময় বাইরে গাড়ির আওয়াজ শুনতে পেলো।বাইরে এসে দেখে নীল আর বৃষ্টি গাড়ি থেকে নামছে।মিসেস সাবিনা বলল,"কিরে এতো দেরি হলো কেন?"
"মম বৃষ্টির কিছু কেনাকাটা করার ছিল ওগুলো করতে করতে দেরি হয়ে গেছে।"
"ওহ আচ্ছা আয় ভেতরে এসে ফ্রেশ হয়ে নে।বৃষ্টি তুই ও আয়।"
"আসছি আন্টি বলে যেই পা বাড়াবে ওমনি সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলো।নীল এসে ধরে ফেলে।
অনু বলল,"বৃষ্টি আপু তুমি এ কটা দিন হাইহিল পড়ো না।গ্ৰামের এবড়ো থেবড়ো রাস্তায় সমস্যা হবে।
বৃষ্টিকে পড়ে যেতে দেখে তানহা আর মিম হেসে ফেললো। চন্দ্রা দূর থেকে সব দেখছে। বৃষ্টি আর নীল ফ্রেশ হয়ে এলো। ওদের খাবার দেওয়া হলো। সবাই খেতে লাগল। খাওয়া শেষ করে যার যার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল। চন্দ্রার ঘুম আসছিল না।কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করার পর উঠে ছাদে চলে গেল।অনুদের বাড়ির ছাদটা খুব সুন্দর। কতরকমের ফুলের গাছ লাগানো।ফুল ফুটে আছে। চন্দ্রা বেশ ভালো লাগলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো।
"আচ্ছা আমি তো চাইতাম নীল স্যার যেন আমায় ভুলে যায়।আমার পিছু ছাড়ে। আজ তো তাই হচ্ছে।তাহলে নীল স্যারকে বৃষ্টির সাথে দেখে আমার খারাপ লাগছে কেন?কেন এতো কষ্ট হচ্ছে?তবে কি আমি.....ছি ছি কিসব ভাবছি আমি!এটা কখনোই হতে পারে না।"
"কি এতো ভাবছেন মিস চন্দ্রা?"
নীলের গলা শুনে চন্দ্রা চমকে উঠলো। অস্পষ্ট কন্ঠে বলে উঠলো,"কিছু না স্যার। আমার ঘুম পাচ্ছে।আসছি আমি।"
চন্দ্রা চলে গেল নীল তার চলে যাওয়ার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল।
"এভাবে কতদিন উপেক্ষা করবে আমায় মহারানী।আমিও দেখি তুমি কতদিন আমার থেকে দূরে সরে থাকতে পারো। আমিও আদিয়াত আবরার নীল।আমায় হারিয়ে দেওয়া এত সহজ না মিস চন্দ্রাবতী।"
পরের দিন বিকালে অনুর গাঁয়ে হলুদ।সবাই গাঁয়ে হলুদ নিয়ে ব্যস্ত। সন্ধ্যায় নাচ গান হবে। সবাই সাজগোজ করে রেডি হয়ে গেছে। ছেলেরা সাদা পাঞ্জাবি আর মেয়েরা হলুদ শাড়ি পড়েছে।ছেলে পক্ষ থেকে লোকজন আসবে একটু পরে। চন্দ্রা হলুদ শাড়ি পড়ে ম্যাচিং চুড়ি পড়েছে।মাথায় গাঁদা ফুলের গাজরা দিয়েছে। নীল আরশিকে খুঁজতে এসে দেখে তার সামনে একটা হলুদ পরী দাঁড়িয়ে আছে। চন্দ্রাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো অপ্সরা।এতো নিষ্পাপ পবিত্র লাগছে যা দেখে নীল নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কাঁধে কারোর স্পর্শ পেয়ে নীলের ধ্যান ভাঙলো।
"এতোক্ষণ ধরে তোমায় ডাকছি শুনতে পাচ্ছো না।ওদিকে তাকিয়ে কি ভাবছো?"
নীল ভালোভাবে তাকিয়ে দেখে চন্দ্রা নেই। পেছনে বৃষ্টি দাঁড়িয়ে আছে।
"কি হলো বলো কেমন লাগছে?"
"হুম ভালো বলে নীল চলে গেল।এতো মানুষের ভীড়ে নীলের চোখ জোড়া যেন তার কাঙ্খিত মানুষটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
অনু অনেকক্ষন ধরে দেখছে নীলকে।মুচকি হেসে বলল,"নীল ভাইয়া কাউকে খুঁজছো?"
"হুম মহারানীকে।"
সত্যি কথা বলে জিহ্বা কামড় দিলো।
"না মানে কাকে খুঁজব। কাউকে খুজছি না তো।"
"আমার তো মনে হচ্ছে...."
"খুব পেকেছো তুমি। বিয়ের কনের এতো কথা কিসের।আর তুই এখানে ঘুর ঘুর করছিস কেন?যা গিয়ে বস।"
অনু ভেঙচি কেটে স্টেজে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ছেলে পক্ষের লোকজন আসলো। অতিথিদের আপ্যায়ন করে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হলো।নীলাশা, মিম আর তানহা মিলে ডান্স করলো। আয়াত আর আরশি গান গাইলো।
বৃষ্টি বলল,"চলো না নীল তুমি আর আমি ডান্স করবো।"
"আমি ডান্স পারি না।"
"দেখো না করবে না'
মিসেস সাবিনা বলল,"ও যখন বলছে যা না।"
নীল আর বৃষ্টি ডান্স করলো। এবার চন্দ্রার পালা। চন্দ্রা পার্টনার করার জন্য কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না। ছেলে পক্ষের থেকে একটা ছেলে এসে বলল,"ম্যাডাম আমি অনুর হাসবেন্ড অর্কের বন্ধু রাসেল।আপনি চাইলে আমি আপনার পার্টনার হতে পারি।"
চন্দ্রা রাসেলের সাথে পারফর্ম করতে ইতস্তত করছে। মনে মনে বলল,"গানই তো গাইবো।বলছে যখন রাজি হয়ে যাই।"
চন্দ্রা কিছু বলতে যাবে তখন নীল এসে বলল,"ওনার পার্টনার তো আমি। রাসেল ভাইয়া আপনি না হয় অন্য কাউকে খুঁজে নিন।"
"ওহ ওকে ।"
রাসেল চলে যেতেই চন্দ্রা বলল,"নীল স্যার আপনি ওনাকে পার্টনার হতে দেন নি কেন?'
"কারন আমি ছাড়া অন্য কেউ তোমার পার্টনার হবে না।"
নীল চন্দ্রার হাত ধরে স্টেজে উঠলো।তারপর মাইক হাতে নিয়ে গান শুরু করলো।
"""কোনো মেঘের ছেঁড়া পালে
ভাসে তোমার প্রেমের তরী
তুমি আমার ভালোবাসার প্রথম হাতেখড়ি।কোনো পাখির কোলাহলে
দেখি তোমার লুকোচুরি
তুমি আমার ভালোবাসার প্রথম হাতেখড়ি।আবছা দূরে রৌদ্র ছায়ায়
আকাশ ভরা তারায় তারায়
রাত বেরাতে তোমার সাথে
স্বপ্ন ডানায় উড়ি
তুমি আমার ভালোবাসার প্রথম হাতেখড়ি।""
সবাই গান শুনে খুশি হলো।নীলাশা এসে বলল,"আমার ভাই যে এতো সুন্দর গান গাইতে পারে আমি তো জানতামই না। খুব ভালো গেয়েছো চন্দ্রা।"
চন্দ্রা সবার এতো প্রশংসা শুনে লজ্জা পেল। অনুষ্ঠান শেষে সবাই খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ল।পরের দিন সকালে উঠে সবাই কাজ নিয়ে ছোটাছুটি করলো।অনুকে সাজানোর দায়িত্ব নীলাশা আর চন্দ্রার উপর পড়লো।
চন্দ্রা বলল,"একদম নড়বি না অনু। চুপচাপ বসে থাকবি।নড়লে সাজ ভালো হবে না।"
"চন্দ্রা একদম ঠিক বলেছে।লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকবি।"
আয়াত আর আরশি এসে বলল,"আমরা সাজুগুজু করবো তো। আমাদের সাজুগুজু করিয়ে দাও।"
"সোনা তোমরা পরে সাজবে আগে আন্টিকে সাজিয়ে দেই।"
"আচ্ছা আমরা তবে বসি। মাম্মা দুষ্টুমি করবো না।"
ওদের কথা শুনে চন্দ্রা আর নীলাশা হেসে ফেললো। একটু পরে বৃষ্টি এসে বলল,"তোমরা নীলকে দেখেছো?"
নীলাশা বলল,"না তো দেখি নি।"
"ঠিক আছে।"
"কেন নীলকে কি দরকার?"
"আমার শাড়ির কুচিগুলো ঠিক করে দেওয়ার জন্য।"
"আমি দিচ্ছি।"
"না আপু। আমার নীলকে লাগবে।"
"খুঁজে দেখ আশেপাশে আছে।"
বৃষ্টির কথা শুনে চন্দ্রার রাগ তরতর করে বাড়তে লাগলো। নিজেকে যেন কোনো ভাবে সামলাতে পারছে না।অনুকে সাজিয়ে দিলো।অনুর মা এসে বলল,"বাহ আমার মেয়েটাকে তো দারুন লাগছে।"
তানহা বলল"কেমন সাজালো দেখলে।অর্ক ভাইয়ার চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে।"
অনু তানহার মাথায় চাটি মেরে বলল,"ধ্যাত কি যে বলিস।"
চন্দ্রা বলল,"থাক আপনাকে লজ্জা পেতে হবে না।শোন একদম রুম থেকে বের হবি না। চুপচাপ বসে থাকবি।"
আন্টি বলল,"তোরা গিয়ে সেজে নে। একটু পর তো বর চলে আসবে।তখন সময় পাবি না।"
অনুকে বসিয়ে চন্দ্রা আয়াত আরশিকে সাজিয়ে দিলো।
"তোমরা দুজন আন্টির কাছে থাকো। পাহারা দাও আন্টি যেন দুষ্টুমি না করে আর তোমরাও লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকো আমরা আসছি।"
নীলাশা আর চন্দ্রা সাজতে গেল।নীলের রুমের পাশ দিয়ে যেতেই শুনতে পেল বৃষ্টির গলা। চন্দ্রা উঁকি মেরে দেখে নীল বৃষ্টির শাড়ির কুচি ঠিক করে দিচ্ছে।চন্দ্রার কান্না চলে আসলো। রুমে গিয়ে কান্না করতে লাগলো।
"চন্দ্রা এই চন্দ্রা হলো তোমার"
আঁখির গলার আওয়াজ শুনে চোখ মুছে নিলো।
"এই তো ভাবি রেডি হচ্ছি।"
"তাড়াতাড়ি করো।বরপক্ষ এলো বলে।"
চন্দ্রা একটা শাড়ি পড়লো ।সাথে হালকা কিছু গয়না।তানতা এসে বলল.......
***চলবে***
